বক্সা বন, আলিপুরদুয়ার জেলার উত্তরে হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এক রহস্যময় ও প্রাচীন বনভূমি। এই অরণ্য শুধু প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের জন্য নয়, বরং এর ইতিহাস ও কিংবদন্তির জন্যও সমানভাবে সমৃদ্ধ। যুগ যুগ ধরে বক্সা বন নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে রয়েছে, যেখানে প্রকৃতি, রাজনীতি ও সংগ্রাম একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এই অঞ্চলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হলো বক্সা দুর্গ। ইতিহাস বলছে, তিব্বত ও ভুটান থেকে আসা ব্যবসায়ীরা দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করতে এই পথ ব্যবহার করত। বক্সা দুর্গ ছিল সেই বাণিজ্যপথের এক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। পরে ব্রিটিশরা এই দুর্গ দখল করে একে কারাগারে পরিণত করে। স্বাধীনতা আন্দোলনের বহু সংগ্রামী এখানে বন্দি ছিলেন, যার মধ্যে অনেকে ছিলেন বিপ্লবী ও বৌদ্ধ ভিক্ষু।
১৯৫০-এর দশকে তিব্বতে চীনা দমন-পীড়নের সময় বহু তিব্বতি আশ্রয় নিয়েছিল বক্সার দুর্গে। আজও সেই ইতিহাসের চিহ্ন বহন করে এই স্থান।
বক্সা টাইগার রিজার্ভ, যা ১৯৮৩ সালে ঘোষণা করা হয়, সেটিও এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে বাড়িয়ে তোলে। এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় টাইগার রিজার্ভ, যার উদ্দেশ্য ছিল বিপন্ন বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ। যদিও বর্তমানে বাঘ দেখা কঠিন, তবুও এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও বন্যজীবনের ইতিহাস চমকপ্রদ।
বক্সা বনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়া ছোট ছোট নদী, যেমন দ্রংপা, জয়ন্তী, ও চিলাপাতা—সবই ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। স্থানীয় মানুষের মুখে শোনা যায় নানা লোককাহিনি, যা ইতিহাসকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
বক্সা বন তাই শুধু একটি পর্যটন গন্তব্য নয়, বরং ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এক জীবন্ত পাঠশালা। এই বনের প্রতিটি গাছ, পাথর ও পথ যেন গল্প বলে—এক অজানা অতীতের, সাহসিকতার, এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের।

