বক্সা বনের গ্রামজীবন: জঙ্গলের কোলে এক সরল, সংগ্রামী জীবন

আলিপুরদুয়ার জেলার বক্সা বনের গভীরে ও আশপাশে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট ছোট কিছু গ্রাম, যেখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে বেঁচে থাকে। এইসব গ্রামের জীবনযাপন আধুনিক শহর থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখানকার মানুষ প্রকৃতির নিয়মেই চলে, যেখানে সূর্যোদয়ের সঙ্গে দিন শুরু হয় এবং সন্ধ্যার আগেই জীবন থমকে যায়।

এই অঞ্চলের আদিবাসী ও বনবাসী জনগোষ্ঠী, যেমন রাজবংশী, শান্টাল, ও ওরাওঁ সম্প্রদায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অরণ্যের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। জীবিকা মূলত কৃষিকাজ, মধু সংগ্রহ, কাঠ কাটা ও অরণ্যজ উপাদান সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল। অনেকেই বন দপ্তরের অধীনে কাজ করে থাকেন, আবার কেউ কেউ স্থানীয় পর্যটকদের জন্য হোমস্টে চালান।

শিক্ষা ও চিকিৎসার সুবিধা এখনও সীমিত। গ্রামের শিশুরা কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে দুরবর্তী স্কুলে যায়। বৃষ্টির দিনে এই রাস্তাগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তবু অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও জীবনের প্রতি ভালোবাসায় তারা এগিয়ে চলে।

এই গ্রামের মানুষরা অতিথিপরায়ণ ও আন্তরিক। জঙ্গলের মধ্যে থেকেও তারা সুরে, ছন্দে, আর লোকসংগীতে জীবনকে রাঙিয়ে রাখে। উৎসব-পার্বণ, যেমন কারাম, সোহরাই কিংবা দুর্গাপূজা—এগুলো গ্রামের সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বক্সা জঙ্গলের আশেপাশের গ্রামগুলোর জীবন একদিকে যেমন কঠিন ও সংগ্রামী, তেমনই স্বকীয় ও আত্মনির্ভরশীল। প্রযুক্তি ও আধুনিকতার ছোঁয়া এখনও সীমিত হলেও, প্রকৃতির সঙ্গে গড়ে ওঠা এই মানুষের জীবনযাত্রা এক শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।

আজও যখন আমরা শহরের যান্ত্রিক জীবনে হাপিয়ে উঠি, তখন এইসব জঙ্গল-গ্রামের সরল অথচ গভীর জীবনদর্শন আমাদের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়—জীবনের প্রকৃত মানে খুঁজে পেতে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *